মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল, ২০১২

নরসিংদীর ঘটনা পরিকল্পিত

নরসিংদী, এপ্রিল ০৩
 নরসিংদীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ছয় ব্যক্তিকে ছিনতাইকারী বলা হলেও তাদের স্বজনরা বলছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। 


এদিকে সহস্রাধিক বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত র‌্যাব মঙ্গলবার কথিত এই বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে তাদের বক্তব্যে নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছে। 

সোমবার ‘ছিনতাই করে পালানোর সময় বন্দুকযুদ্ধের’ কথা জানালেও মঙ্গলবার তারা বলছে, একটি ডাকাতি শেষে আরেকটি ডাকাতির প্রস্তুতির সময় বন্দুকযুদ্ধ হয়। 

সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর ব্রিজ এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন নাহিদ মোল্লা (১৮), আরিফ (১৮), মাসুম আফ্রাদ (৩০), মোশাররফ (৩৫), মোবারক হোসেন (৩০) ও জামাল (৩৫)। 

নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি আসাদুজ্জামান মঙ্গলবার জানান, নিহতদের প্রথম দুজন চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন; দুজন গাড়িচালক; একজন মিস্ত্রী এবং অন্যজন নারায়ণগঞ্জে থাকতেন। 

সোমবারের ঘটনায় দুই র‌্যাব সদস্যসহ পাঁচ জন আহত হন বলেও সেদিন জানায় বাহিনীটি। এ সময় আহত অন্যরাও ছিনতাইকারী বলে র‌্যাবের দাবি। 

এরা হলেন- রায়পুরা উপজেলার পিরিজকান্দী গ্রামের সুরেশচন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে ওমর বিশ্বাস (৩৮), শিবপুর উপজেলার ওমরকান্দী গ্রামের আমিন উদ্দিনের ছেলে মাসুম (২৮), একই উপজেলার কুমরাদী গ্রামের আমিন উদ্দিনের ছেলে শাওন (২৫)। এদেরসহ নরসিংদী সদর উপজেলার পাথরপাড়া গ্রামের সুরুজ মিয়ার ছেলে মনির হোসেনকে (৩০) সোমবার গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। 

‘বন্দুকযুদ্ধের’ এ ঘটনায় র‌্যাব ১১-এর ডিএডি জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে মঙ্গলবার বিকেলে নরসিংদী সদর মডেল থানায় অস্ত্র, ডাকাতির প্রস্তুতি ও সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করেন। 

নিহত ও গ্রেপ্তারকৃত সবাইকে অস্ত্র ও ডাকাতি মামলার আসামি করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তারকৃতদের সরকারি কাজে বাধার মামলায়ও আসামি করা হয়। 

নরসিংদী সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তাদের মৃতদেহ মঙ্গলবার বিকালে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন ওসি আসাদুজ্জামান। 

স্বজনের মুখে নিহতদের কথা 

নরসিংদী শহরের দক্ষিণ বিলাসদী মহল্লার (পুলিশ সুপার অফিস সংলগ্ন) হোসেন মোল্লার ছেলে নাহিদ। তার বড় ভাই লোকমান মোল্লা নরসিংদী পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ভাই মীর এমদাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেয়। সে ছিনতাই করতে পারে না। 

“তাকে হত্যা করার পর ষড়যন্ত্রমূলক এ ঘটনায় জড়িত করা হয়েছে।” 

এ বছরই এসএসসি পরীক্ষা দেন শহরের ভেলানগর মহল্লার আবুল হাসিম মিয়ার ছেলে আরিফ। তিনি পরীক্ষায় অংশ নেন কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। 

অন্যদিকে ট্রাকচালক মাসুম আফ্রাদ শিবপুর উপজেলার মাছিমপুর ইউনিয়নের বান্দারদিয়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিন আফ্রাদের ছেলে। 

তার বড় বোন ঝরনা বেগম বলেন, “আমার ভাই ট্রাক ড্রাইভার।” 

মাসুম ১০ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “ঘটনার দিন সে ঘটনাস্থল সংলগ্ন জমি থেকে ট্রাকে মাটি ভরাট করে ইটাখোলায় নিয়ে যাওয়ার সময় র‌্যাব তাকে গুলি করে হত্যা করে।” 

“সে ছিনতাইকারী ছিল না। তাকে হত্যা করার পর তার ওপর দোষ চাপানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।” 

আরেক নিহত গাড়িচালক মোশাররফ নরসিংদী সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের কুড়েরপার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আউয়ালের ছেলে। 

তিনি ছিনতাইকারী নন দাবি করে তার মা ফজিলা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক আমার ছেলে মোশাররফ। সে পাশের গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মাইক্রোবাসের ড্রাইভার ছিল।” 

তিনি দাবি করেন, তার ছেলেকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হত্যা করেছে র‌্যাব। 

তিনি বলেন, “আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই আমি। অপরাধী হলে তার বিচার আদালতে হওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।” 

সেদিন নিহত আরেক জন মোবারক হোসেন রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মেরাতলা গ্রামের কাশেম আলীর ছেলে। তিনি পেশায় সাইন বোর্ড মিস্ত্রি। 

নিহত জামাল ছিলেন নরসিংদীর পলাশ উপজেলার নোয়াকান্দা গ্রামের আক্কাছ আলীর ছেলে। ওসি আসাদুজ্জামান জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ উপজেলাধীন ভূলতা এলাকায় বসবাস করতেন। 

তার পেশা জানা যায়নি। 

র‌্যাবের বক্তব্য 

র‌্যাব ১১-এর (কোম্পানি অধিনায়ক সিপিসি-৩) মেজর গোলাম সারওয়ার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গলবার বলা হয়, “র‌্যাব ১১ আদমজীনগর নারায়গঞ্জের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু হেনা মো. মোস্তফা খবর পান, নরসিংদী শহরে এক ব্যবসায়ীর ৪০ হাজার টাকা ডাকাতি করে শহর ও আশপাশে ঘোরাফেরা করছে এক দল ডাকাত।” 

ওই টাকা উদ্ধার ও ডাকাতদের গ্রেপ্তারের উদ্দেশে র‌্যাব ১১-এর অধিনায়কের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালায় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। 

এতে বলা হয়, “ডাকাত দল আরো একটি ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নং ব্রিজের কাছে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় লে. কর্নেল আবু হেনার নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল সেখানে পৌঁছালে ডাকাতরা র‌্যাবের মাইক্রোবাসের সামনে একটি ট্রাক থামিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয় এবং পেছনের একটি মাইক্রোবাস থেকে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে।” 

‘সরকারি জানমাল রক্ষা ও আত্মরক্ষার্থে র‌্যাব সদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে’ ছয় ছিনতাইকারী নিহত এবং অন্যরা আহত হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। 

এ ছাড়া র‌্যাবের এসআই শহীদ ও সিপাহী সাইফুল ইসলাম আহত হন। 

র‌্যাব জানায়, এ ঘটনায় ছিনতাইকারীদের ব্যবহৃত মাইক্রোবাস, তিনটি পিস্তল, একটি এলজি, একটি কার্তুজ, দুটি চাকু, ১০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ছিনতাই হওয়া নগদ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। 

আহতদের প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতাল ও পরে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন