বৃহস্পতিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১২

সময় ‘না দিয়েই’ উচ্ছদ


সময় ‘না দিয়েই’ উচ্ছেদ
Thu, Apr 5th, 2012 8:58 pm BdST
 


ঢাকা, এপ্রিল ০৫ - রাজধানীর গুলশান লেক সংলগ্ন কড়াইল বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযানের আগে জিনিসপত্র সরাতে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বস্তিবাসীর।

বস্তিবাসীর এই অভিযোগ সমর্থন করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেত্রীও। উচ্ছেদ অভিযানের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

বস্তিবাসীরা আরো দাবি করেছেন, উচ্ছেদের সময় একটি শিশু বুলডোজারের আঘাতে মারা গেছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর ওই শিশুর মৃত্যু হয়, বস্তিবাসীরা এ কথা বললেও কেউই হাসপাতালের নাম জানাতে পারেননি।

এছাড়া উচ্ছেদ অভিযানের সময় থেকে একটি শিশু নিখোঁজ বলে ওই শিশুটির বাবা-মা জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিম সেলিম হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে বুধবার কড়াইল বস্তি এলাকায় দিনভর উচ্ছেদ অভিযানে শতাধিক কাঁচা ও আধাপাকা ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার চলে দ্বিতীয় দিনের অভিযান।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূরে আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গুলশান লেক উদ্ধারে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।

উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবাদে বস্তিবাসীর বিক্ষোভের কারণে বৃহস্পতিবার প্রায় আড়াই ঘণ্টা গুলশান-মহাখালী সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে।

ওই বস্তিতে ১০ বছর ধরে বসবাসরত হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সইর‌্যা যাওনের জন্য হেরায় মাইকিং শুরু করছে গতকাইল (মঙ্গলবার) বিকাল থেইক্যা। হেইডাও অনেকে হুনছে, অনেকে হুনে নাই।”

মাসের চার দিন অতিক্রান্ত হওয়ায় অন্য স্থানে ঘর ভাড়া পাওয়া দুষ্কর ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “মাসের চাইর পাঁচ তারিখে এই ঢাকা শহরে কেডায় আমাগো ঘর ভাড়া দিব?”

একই কথা বলেন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি রুহুল আমিনও- “এত অল্প সময়ে মাল ক্যামনে সরাই। একটা সংসারে কী কম জিনিস থাকে?”

বৃহস্পতিবার দুপুরে মহাখালী ওয়্যারলেস গেট দিয়ে ঢুকে টিঅ্যান্ডটি অফিসের দিকে যাওয়ার পথে বস্তির শুরু থেকেই কয়েকশ কাঁচা, আধপাকা ঘরগুলো স্তূপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে পশ্চিমপাড়া বেলতলি এলাকায় প্রায় সব ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেলতলি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চললেও বস্তির অন্য অংশের মানুষের মুখেও ছিল উদ্বেগের ছাপ।

উচ্চ আদালতের আদেশে শুধু লেকপাড়ের ঘরগুলো উচ্ছেদের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ অনেকের।

ঢাকার ১৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা নুরুন্নাহার কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছি। উনিও বলছেন আগে এই এলাকার ঘর ভাঙার কথা নয়।”

“উচ্ছেদ শুরুর আগে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের বলছে, টিঅ্যান্ডটি অফিসে ঢোকার আগের রাস্তার দুই পাশে ১০ ফুট করে জায়গা ভাঙবে। সেই হিসাবে এলাকার লোকজন মালপত্র সরিয়েছিল। কিন্তু পরে তারা টিঅ্যান্ডটি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর ইন্ধনে রাস্তার বামপাশে দুইশ ফুটেরও বেশি জায়গায় বুলডোজার চালিয়েছে,” বলেন তিনি।

বস্তিবাসীদের মধ্যে অসুস্থদেরও ঘর থেকে বের করার জন্য সময় দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন ক্ষমতাসীন দলের এই নেত্রী।

উচ্ছেদ অভিযানের সময় আহত হন দিনমজুর বাবুল। প্লাস্টারে মোড়া বাম হাতটি দেখিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি আমার ঘরের সামনে খাড়ায়া ছিলাম। আমি জানতামই না এই পর্যন্ত ভাঙব। হেই সময় বুলডোজার আমারে ধাক্কা দিসে।”

পশ্চিমপাড়া বেলতলি এলাকায় বসবাসরতরা অভিযোগ করেন, বুধবার সকালে উচ্ছেদ অভিযানের পর থেকে রিকশাচালক সুলতানের চার বছরের মেয়ে সুলতানাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সুলতানার মা রোকিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকাল ১১টার দিকে আমি রাস্তায় আছিলাম, মাইয়া ঘরে ঘুমাইতেছিল। ঘরের দুই পাশ থেইক্যা দুইটা গাড়ি (বুলডোজার) একসঙ্গে চাপা দিছে। এর পর থেইক্যা মাইয়্যার আর কোনো খোঁজ নাই।”

মেয়ে না পাওয়ার শোবে বিহ্বল সুলতান মিয়া বলেন, “আমি তখন কামে আছিলাম। আইসা দেখি বাচ্চাও নাই, বাড়িও নাই!”

রোকিয়া বেগমের পাশে ভিড় করে থাকা লোকজন ওই সময় সমস্বরে বলে ওঠেন, বস্তির একই অংশে বসবাসরত ফল ব্যবসায়ী রফিকের শিশুপুত্র বুলডোজারের আঘাতে আহত অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে একটি হাসপাতালে মারা গেছে।

রফিক এবং তার পরিবারের কোনো খোঁজ দিতে পারেননি বস্তিবাসীরা। শিশুটি কোন হাসপাতালে মারা গেছে, তাও জানাতে পারেননি তারা।

বিক্ষোভ-অবরোধ

উচ্ছেদের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষোভ শুরু করে উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসী। তারা গুলশান থেকে মিছিল নিয়ে মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত আসে এবং যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এবং মহাখালী ফ্লাইওভারেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় এয়ারপোর্ট রোড, বনানী, জাহাঙ্গীর গেইট ও তেজগাঁওসহ আশেপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজট। অফিসগামী যাত্রী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আকলিমা খাতুন বলেন, “ন্যায্য বিচার না করলে আমরা এক পাও নড়–ম না। যারা আমাগোরে খুন করছে আগে তাদের বিচার চাই।”

গুলশান থানার পুলিশ কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, হাজার খানেক নারী-পুরুষ ওই বিক্ষোভে অংশ নেন। যাদের পুলিশ বুঝিয়ে-শুনিয়ে দুপুর ১২টার দিকে রাস্তা থেকে সরায়।

কী আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বস্তিবাসী সড়ক ছেড়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কমিশনার সাহেব (গুলশান জোনের সহকারী উপ কমিশনার নিজামুল হক মোল্লা) বলছেন, এইটা সরকারি কোনো বিষয় নয়, হাই কোর্টের আদেশে হয়েছে। রোববার কোর্ট খুললে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে আপিল করবে। আর পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি ভাঙা হবে না।” 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন