মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা
Sat, Apr 14th, 2012 1:17 am BdST
ঢাকা, এপ্রিল ১৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে বাংলা নতুন বছর, ১৪১৯; বিদায় ১৪১৮।
বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে চলছে প্রস্তুতি; নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে তা চলছে দেশজুড়ে।
নতুন বছর শুরুর প্রাক্কালে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।
অতীতের বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষ সবাইকে সুন্দর আগামী গড়ার প্রত্যয়ে অনুপ্রাণিত করুক, এই আশা করেছেন রাষ্ট্রপতি।
‘এসো হে বৈশাখ’- কবিগুরুর এ গানে শনিবার ভোর সোয়া ৬টায় রাজধানীর রমনার বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু করবে ছায়ানট। ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান শুধু বাঙালির বর্ষবরণের প্রাণই নয়, প্রতিবাদেরও হাতিয়ার।
ছায়ানটের বর্ষবরণের আয়োজন সকাল সাড়ে ৮টায় যখন শেষ হবে, তার কিছু সময় পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি এখন বর্ষরণের উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রাটি শনিবার চারুকলার বকুলতলা থেকে শুরু হয়ে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে দিয়ে ঘুরে শাহবাগ মোড় হয়ে টিএসসি ঘুরে আবার বকুল তলায় চলে আসবে।
প্রতিবছরই বিভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে বের হয় চারুকলার এ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্যে থাকছে সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করা।
শোভাযাত্রায় সমুদ্রজয়কে প্রতীকিভাবে তুলে ধরতে শোভাযাত্রার সামনে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে... রূপকথার সেই ময়ূরপঙ্খী নাওয়ের আদলে তৈরি ৪০ ফুট লম্বা সাম্পান।
আর ভয়ঙ্কর চেহারার একটি জন্তুকে যুদ্ধাপরাধীর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করার আহ্বানও থাকবে।
সাম্পান, ভয়ঙ্কর জন্তু, হাতি, ঘোড়া, বাঘ ছাড়াও এবারের শোভাযাত্রায় পাতার মতো দেখতে একটি বিশেষ পাখিও থাকবে।
নিরাপত্তা
বর্ষবরণের এ উৎসবকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নববর্ষের নিরাপত্তায় ২০টি পয়েন্টে রোড ব্লক ও তল্লাসি চৌকি বসাবে পুলিশ।
এবারই প্রথমবারের মতো রমনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বোমা সনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম দূরনিয়ন্ত্রিত রোবট রাখা হচ্ছে। তাছাড়া থাকছে র্যাব-পুলিশের কড়া নিরাপত্তা প্রহরা। রমনা বটমূলে থাকছে র্যাবের ৪০টি ও পুলিশের ৭৬টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।
রমনা ও সোহওরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরের চারদিকে সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হবে।
রমনায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ঢোকা ও বের হওয়ার নির্দিষ্ট কয়েকটি ফটক নির্ধারণ করে দিয়েছে পুলিশ।
রমনা পার্কে প্রবেশ করা যাবে অরুণোদয় (সুগন্ধার বিপরীতে), রমনা রে¯েঁ-ারা, অস্তাচল (শিশুপার্ক), নতুন গেট (বৈশাখী অস্তাচলের মাঝে), কাররাইল মসজিদ ও মৎস্য ভবনের পাশের গেট দিয়ে।
এছাড়া উত্তরায়ণ (থাই ক্রসিং), বৈশাখী গেট, কাররাইল মসজিদ ও মৎস্য ভবনের পাশের গেট দিয়ে পার্ক থেকে মেলার দর্শনার্থীদের বের হতে বলা হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের পথ করা হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট গেট, টিএসসি গেট ও তিন নেতার মাজার গেট দিয়ে। আর দর্শনার্থীদের বের হওয়ার জন্য চারুকলার বিপরীতে শিশুপার্ক ও কালিমন্দির গেট নিধারণ করা হয়েছে।
শিখা চিরন্তন গেট বন্ধ রাখা হবে বলে পুলিশ জানায়।
নববর্ষের অনুষ্ঠানে কোনো শিশু হারিয়ে গেলে তাকে যাতে সহজে সনাক্ত করা যায় সেজন্য সব শিশুর পকেটে ফোন নম্বর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
বাংলা বিভাগের আয়োজন
বর্ষবরণ উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। সকাল সাড়ে ৮টায় বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শোভাযাত্রা হবে। শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে কলাভবনের সামনে গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করবে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তারা মঞ্চায়ন করবে যাত্রাপালা সোজন বাদিয়ার ঘাট।
শিশুপার্কের সামনে বাউল গান পরিবেশন করবে ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী। এছাড়া রমনা পার্ক এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রবীন্দ্র সরোবরসহ রাজধানীর নানা স্থানে চলবে বর্ষবরণের উৎসব।
ইতিহাস বলে, রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য মুঘল সম্রাট আকবরের যুগে প্রবর্তন হয়েছিল বাংলা সালের। বর্ষশুরুর সে দিনটিই এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব।
বাংলা সালের ইতিহাস
বাদশাহ আকবরের নবরতœ সভার আমির ফতেহ উল¬াহ সিরাজি বাদশাহি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসলি সালের শুরু করেছিলেন হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের মতো মিলিয়ে নিয়ে। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছিলেন ও পয়লা বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। আর বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিলো নক্ষত্র ‘বিশাখা’র নাম থেকে।
ইতিহাসের পাতা উল্টে আরো জানা যায়, পয়লা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান।
আজ আর খাজনা আদায় নেই, কিন্তু রয়ে গেছে উৎসবের সে আমেজ। সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর বন্দর আর গ্রামে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির মাঝে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন