নরসিংদী, এপ্রিল ০৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- যার মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে নরসিংদীতে কথিত ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করার দাবি র্যাব করেছিল, এখন তার সন্ধান দিতে পারছে না তারাও।
র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, গত সোমবার মারুফ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর টেলিফোনের সূত্র ধরে তারা অভিযানে নামেন, যাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ছয় জন নিহত হয়।
নিহত ছয় জনকে র্যাব ‘কুখ্যাত’ ডাকাত বললেও তাদের মধ্যে মাত্র দুজনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এক জনের বিরুদ্ধে মামলা ছিল ডাকাতির প্রস্তুতির, অন্য জনের বিরুদ্ধে ছিল জমি সংক্রান্ত বিরোধের।
নিহত বাকি চার জনের পাশাপাশি আহত ও আটক মিলিয়ে চার জনের বিরুদ্ধেও কোনো মামলার হদিস মেলেনি।
নিহতের স্বজনরা ইতোমধ্যে দাবি করেছেন, নরসিংদীর মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর ব্রিজ এলাকায় সোমবার ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়নি, তা ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকে সমালোচনার মধ্যে থাকার র্যাবের সর্বশেষ ‘বন্দুকযুদ্ধের’ এই ঘটনা তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খান।
সোমবার দুপুরের পর সদর উপজেলার নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর ব্রিজ এলাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ছয় জন, ছিনতাইয়ের পর তাদের ধাওয়া করা হচ্ছিল বলে র্যাবের দাবি।
র্যাব সেদিন বলেছিল, এক ব্যবসায়ীর ৪০ হাজার টাকা ছিনতাই করে মাইক্রোবাসে করে দুর্বৃত্তরা পালানোর সময় ওই ব্যবসায়ী র্যাবকে খবরটি জানান। তখন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু হেনা মোস্তফার নেতৃত্বে র্যাব-১১ অভিযানে নামে। নারায়ণগঞ্জের আদমজীনগরে এই ব্যাটালিয়নটির সদর দপ্তর।
‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ র্যাব শুরুতে ওই ব্যবসায়ীর পরিচয় প্রকাশ করতে অনীহ হলেও পরে র্যাবের দাবি নিয়ে নিহতদের স্বজনরা প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষাপটে তার নাম প্রকাশ করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই ব্যবসায়ীর নাম মারুফ হোসেন। তিনি থাকেন ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায়।
মারুফ কোথায় রয়েছেন- জানতে চাওয়া হলে র্যাব-১১ এর উপপরিচালক মেজর খন্দকার গোলাম সারওয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘটনার পর থেকেই মারুফ হোসেনের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।”
ওই ব্যবসায়ী ‘ছিনতাইয়ের’ ঘটনাটি র্যাবের পাশাপাশি পুলিশকেও জানিয়েছিলেন বলে জানান নরসিংদী সদর থানার ওসি আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “আমি তাকে জিডি বা মামলার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি জিডি বা মামলার জন্য আসেননি। এমনকি ঘটনার পর থেকে তাকে পাওয়াও যাচ্ছে না।”
‘১০ জনের মধ্যে মামলা ছিল মাত্র দুজনের বিরুদ্ধে’
কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত নাহিদ মোল্লা (১৮), আরিফ (১৮), মাসুম আফ্রাদ (৩০), মোশাররফ (৩৫), মোবারক হোসেন (৩০) ও জামালের (৩৫) মধ্যে শুধু দুজনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার খবর পাওয়া গেছে; তবে র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ছিল কুখ্যাত ডাকাত এবং এলাকাবাসী তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল।
পলাশ উপজেলার নোয়াকান্দি গ্রামের জামালের বিরুদ্ধে পলাশ থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে একটি মামলা রয়েছে।
পলাশ থানার ওসি আতিকুর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, ওই মামলায় জামালের বিরুদ্ধে পরোয়ানাও ছিল। তবে এছাড়া আর কোনো মামলা ছিল না।
জামালের বাড়ি পলাশে হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা এলাকায় থাকতেন।
সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, জমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি মামলা রয়েছে নিহত আরিফের বিরুদ্ধে।
শহরের ভেলানগর মহল্লার আবুল হাসিম মিয়ার ছেলে আরিফ (১৮) চলতি বছর কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।
শহরের দক্ষিণ বিলাসদী মহল্লার (পুলিশ সুপার অফিস সংলগ্ন) হোসেন মোল্লার ছেলে নাহিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বলে জানিয়েছেন সদর থানার ওসি আসাদুজ্জামান।
চলতি বছর মীর এমদাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন নাহিদ। তার বড় ভাই তার বড় ভাই নরসিংদী পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী লোকমান মোল্লা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ভাইকে হত্যা করার পর ষড়যন্ত্রমূলক এ ঘটনায় জড়িত করা হয়েছে।”
এছাড়া নিহত শিবপুর উপজেলার মাছিমপুর ইউনিয়নের বান্দারদিয়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিন আফ্রাদের ছেলে ট্রাকচালক মাসুম আফ্রাদ, সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের কুড়েরপার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আউয়ালের ছেলে মোশাররফ এবং রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মেরাতলা গ্রামের কাশেম আলীর ছেলে সাইনবোর্ড মিস্ত্রি মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ট্রাকচালক মাসুম আফ্রাদের বড় বোন ঝরনা বেগম বলেন, “ঘটনার দিন সে (মাসুম) ঘটনাস্থল সংলগ্ন জমি থেকে ট্রাকে মাটি ভরাট করে ইটাখোলায় নিয়ে যাওয়ার সময় র্যাব তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।”
‘বন্দুকযুদ্ধে’ আহত রায়পুরা উপজেলার পিরিজকান্দী গ্রামের সুরেশচন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে ওমর বিশ্বাস (৩৮), শিবপুর উপজেলার ওমরকান্দী গ্রামের আমিন উদ্দিনের ছেলে মাসুম (২৮) এবং একই উপজেলার কুমরাদী গ্রামের আমিন উদ্দিনের ছেলে শাওন (২৫) এর নামে কোনো মামলা ছিল না।
আহতদের পাশাপাশি আটক নরসিংদী সদর উপজেলার পাথরপাড়া গ্রামের সুরুজ মিয়ার ছেলে মনির হোসেনের (৩০) বিরুদ্ধেও কোনো মামলার খোঁজ পাওয়া যায়নি।
র্যাব-১১ এর উপপরিচারক মেজর খন্দকার গোলাম সারওয়ার দাবি করেছেন, গ্রেপ্তার মাসুমের বিরুদ্ধে শিবপুর থানায় একটি মামলা রয়েছে।
তবে শিবপুর থানার ওসি বেলায়েত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার থানায় মাসুমের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।
তবে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ পর এ ঘটনায় র্যাব ১১-এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) জামাল উদ্দিন মঙ্গলবার নরসিংদী সদর মডেল থানায় অস্ত্র, ডাকাতির প্রস্তুতি ও সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে তিনটি মামলা করেন। নিহত ও গ্রেপ্তার সবাইকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন